বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৬:২৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
Kushtia DC Towhid Bin Hasan, the Bureaucratic ‘Lord’ Mindset, and a Satirical Take! কুষ্টিয়ার ডিসি তৌহিদ বিন হাসান, আমলাতন্ত্রের ‘লর্ড’ মানসিকতা ও একটি রম্য রচনা! কখন এবং কী কারণে আইনজীবী সনদ বাতিল হতে পারে? কুষ্টিয়ার ‘ফুসফুস’ কি তবে ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে? ডি-টাইপ কোয়ার্টারের সবুজ চত্বর ফিরিয়ে দিন! ব্যবসায়ী থেকে গভর্নর: আর্থিক খাতে নতুন চমকের নাম মোস্তাকুর রহমান : অয়ন আহমেদ পার্বত্য মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের সাথে বিশ্বশান্তি কুঠির প্রতিনিধি দলের সৌজন্য সাক্ষাৎ একুশে বইমেলায় আসছে সাংবাদিক মোস্তফা খানের উপন্যাস ‘একটি কলমের দাম’ তারেক রহমানকে সেক্রেটারিয়েট জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন’র অভিনন্দন দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও সহযোগিতায় সাংবাদিকতার ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন দ‌ক্ষিণ এ‌শিয়ার নিরাপত্তা ও উন্নয়ন: মিডিয়ার দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জা‌তিক সংলাপ

কুষ্টিয়ার ডিসি তৌহিদ বিন হাসান, আমলাতন্ত্রের ‘লর্ড’ মানসিকতা ও একটি রম্য রচনা!

Reporter Name / ৫৩৫ Time View
Update : রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬

এডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক
এইতো ২৩ মে, শনিবার। সকাল ১০.৩০। দি ডেইলি অবজারভার পত্রিকার একটি বিশেষ এ্যাসাইন্টমেন্টে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোঃ তৌহিদ বিন হাসান সাহেবের কক্ষে ঢুকলাম। মুহূর্তেই বুঝতে পারলাম আমলাতন্ত্রের মহাশূন্যে সাধারণ মানুষের আত্মসম্মানের ওজন ‘শূন্য শতাংশ’। যিনি ২০২৬ সালের মার্চ মাসে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

পিএস জানালেন, “স্যার একাই আছেন।” মনে মনে ভাবলাম, ভাগ্যিস! আজ হয়তো কুষ্টিয়ার ভাগ্যবিধাতার সাথে মনের সুখে দুটো পেশাগত আলাপ হবে। কিন্তু ভেতরে ঢুকেই থমকে গেলাম। বুঝলাম, আমি আসলে একবিংশ শতাব্দীর কোনো ‘লর্ড’-এর দরবারে হাজির হয়েছি, যেখানে আমজনতার প্রবেশ নিষেধ না হলেও ‘উপেক্ষা’ অবধারিত।

রাষ্ট্রের অতি-গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজে স্যার ফোনে মগ্ন। আমি ঠায় দাঁড়িয়ে। সেকেন্ড কাটল, মিনিট কাটল, কিন্তু স্যারের ফোনালাপ কাটে না। না মিলল সৌজন্যমূলক একটা চাউনি, না মিলল ইশারায় বসার অনুমতি। অগত্যা শিষ্টাচারের মাথা খেয়ে ফোনের লাইনের ফাঁক গলে একটা “সালাম” ছুঁড়ে দিলাম। কিন্তু আফসোস, সেই সালাম স্যারের কানে পৌঁছালেও আমলাতান্ত্রিক হৃদয়ে পৌঁছাল না।

দেশ-বিদেশের ডিগ্রি, দেশের সর্বোচ্চ আদালতে আইন পেশা, দীর্ঘদিনের আইন সাংবাদিকতা সবকিছু পকেটে পুরে অবশেষে একটু ‘বেয়াদবের’ মতোই একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লাম। কারণ, দাঁড়িয়ে থেকে আমার দামী জুতো জোড়ার ওপর চাপ বাড়ছিল, কিন্তু স্যারের ফোনের কথা শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণই ছিল না।

বসার অপরাধেই হোক বা ফোন কাটার বিরক্তি স্যার আমার দিকে তাকালেন। আহা, সে কী চাহনি! যেন কোনো এক মহাজাগতিক অপরাধীকে দেখছেন। মেঘমন্দ্র স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “কী আপনার?” সংক্ষেপে বলুন।

স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ‘দি ডেইলী অবজারভার’-এর পরিচয় দিয়ে পত্রিকার একটা অফিশিয়াল অ্যাসাইনমেন্টের কথা তুলতেই স্যার এক ঝটকায় বুঝিয়ে দিলেন সাধারণ জ্ঞান ও আমলাতন্ত্রের দূরত্ব কতখানি! মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন, “ডিসি অফিস সে জায়গা নয়।”

আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। মনে মনে ভাবলাম, জেলার ৮০টি কমিটির সভাপতি যিনি, জেলার হর্তাকর্তা বিধাতা যিনি, তার অফিস যদি সে জায়গা না হয়, তবে কি সেটা কোনো বিনোদন পার্ক? বিনীতভাবে মনে করিয়ে দিলাম ওনার দায়িত্বের পরিধি। কিন্তু স্যার ততক্ষণে ‘আমলাতান্ত্রিক পাসিং শট’ খেলে দিয়েছেন”এটা এডিসি জেনারেল দেখছেন। আপনি যান।” অর্থাৎ, ‘তাড়াতাড়ি বিদায় হোন’।

যাহোক, স্যারের এই অপরূপ ও মুগ্ধকর আচরণে “অভিভূত” হয়ে চেম্বার থেকে বেরিয়ে এলাম। তবে মনে একটা জিদ চাপল। ভাবলাম, সামনাসামনি তো বাংলা ভাষার ওজন বুঝলেন না, ওনার ভেতরের ‘সাহেবিয়ানা’ জাগাতে এবার একটু লর্ডদের ভাষায় চেষ্টা করা যাক।

হোয়াটসঅ্যাপে একদম ঝরঝরে, ব্যাকরণসম্মত শুদ্ধ ব্রিটিশ ইংরেজিতে পুরো অ্যাসাইনমেন্টের বিষয়টা লিখে একটা টেক্সট পাঠালাম। ওহ! কী অলৌকিক ক্ষমতা ইংরেজির! যে মানুষটা একটু আগে আমাকে সামান্য বসার অনুমিতটুকু দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি, শুদ্ধ ইংরেজি দেখেই ওনার ভেতরের সুপ্ত ‘আইসিএস’ অফিসার হয়তো নড়েচড়ে বসল। ঝটপট মেসেজের উত্তর এলো, সাথে বোনাস হিসেবে যুক্ত হলো ধর্মীয় আবেগ”ফি আমানিল্লাহ”।

ভাবলাম, যাক বাবা! ইংরেজির গুঁতোয় বরফ গলেছে। কিন্তু আমলাদের মন আর আকাশের মেঘ কখন রঙ বদলায়, তা স্বয়ং বিধাতাই ভালো জানেন। মুখে ‘ফি আমানিল্লাহ’ বললেও পরক্ষণেই ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বিপরীত কাজটি করে বুঝিয়ে দিলেন আমলারা মুখে যা বলেন, কাজে তার উল্টোটাই করেন।

তার এ আচরণে মনে হচ্ছিল বাংলাদেশের জেলা প্রশাসকেরা হলেন ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রের এক জীবন্ত জাদুঘর। ঔপনিবেশিক আমলের ছড়ি ঘোরানো দম্ভ আর আধুনিক প্রজাতন্ত্রের ক্ষমতার এক অদ্ভুত মিশেল তাঁদের চরিত্রে দেখা যায়। ডিসি শুধু জেলা প্রশাসক নন, তিনি একই সঙ্গে জেলা কালেক্টর ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি নিজেই আইন তৈরি করবেন, নিজেই কর আদায় করবেন, আবার নিজেই বিচার বসাবেন। তাঁর মুখের এক খোঁচায় ফুটপাথের দোকান উধাও হয়ে যায়, আবার নিমিষেই বিশাল অট্টালিকা গুঁড়িয়ে যায়। জেলার আকাশ-বাতাস থেকে শুরু করে পুকুরের মাছ পর্যন্তÍ সবকিছু যেন তাঁর অদৃশ্য নির্দেশে চলে। “ডিসি স্যারের হুকুম” যেন জেলার সর্বোচ্চ সংবিধান!

ডিসি স্যারের গাড়ির হর্ন শুনলেই ট্রাফিকের লাল বাতিও সবুজ হয়ে যায়। তাঁর খাস কামরায় প্রবেশের আগে ফাইল যেভাবে কেঁপে ওঠে, তাতে মনে হয় ফাইলগুলো যেন ভয়েই অর্ধেক হলুদ হয়ে গেছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কাঁচি হাতে ফিতা কাটা থেকে শুরু করে প্রধান অতিথির চেয়ারে বসা সবকিছুতেই যেন এক রাজকীয় ভাব।

তাঁদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো মোবাইল কোর্ট। বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়লেও ডিসি সাহেব, আবার রাস্তায় গাড়ি ঠিকমতো না চললেও ডিসি সাহেব। তাঁর সামনে পড়লে বাঘে-মহিষও এক ঘাটে জল খায়।

বাস্তবে দেখা যায়, ডিসি জেলার প্রায় ৮০টি কমিটির সভাপতি। তাহলে প্রশাসনিক কাজের গতি বাড়বে না বরং কমবে। জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর পত্রিকায় একটি টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি ছাপবে সেটাও ডিসি’র কাছে ফাইল সই করতে হয়। যার দপ্তরের কাজ তিনি যদি কমিটির সভাপতি হতেন, তাহলে সেই কাজটি আরো গতিশীল হতো। একজন মানুষকে কেন এতগুলো কমিটির সভাপতি হতে হবে? এরপরও ডিসি সাহেবরা আরো ক্ষমতা চান।

পরিশেষে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোঃ তৌহিদ বিন হাসান সাহেবের কাছে জিজ্ঞাসা আপনি তো ‘ডেপুটি কমিশনার (ডিসি)’। কিন্তু আপনি তো ‘জেলা প্রশাসক’ লেখেন যা দেশের কোনো আইন-বিধিতে আছে? এ লেখাটি লিখতে গিয়ে বেশ পড়াশুনা করতে হলো। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সরকারি কর্মচারীদের জন্য ‘পদবির পরিভাষা’ শীর্ষক প্রকাশনার ৬২ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘ডেপুটি কমিশনার’-এর বাংলা পরিভাষা করা হয়েছে ‘জেলা প্রশাসক’। কিন্তু একই পৃষ্ঠায় ‘ডেপুটি কমিশনার অব ট্যাক্সেস’-এর বাংলা পদনাম করা হয়েছে ‘উপকর কমিশনার’, ‘ডেপুটি কমিশনার অব কাস্টমস’-কে বলা হয়েছে ‘উপকর কমিশনার, কাস্টমস’, ‘ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ’-কে বলা হয়েছে ‘উপপুলিশ কমিশনার’। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে ‘ডেপুটি কমিশনার’-এর বাংলা পদনাম ‘জেলা প্রশাসক’ কীভাবে হলো?

তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ এর আওতায় ‘জেলা প্রশাসক’ শব্দের উৎপত্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কাছে তথ্য জানার পরামর্শ দেয়।

প্রকৃতপক্ষে প্রশাসক শব্দের মাধ্যমে একটি মাতবরি বা মোড়লিপনার ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা বলে মনে করি। সরকারি কর্মচারীদের এমন মনোভাব গ্রহণযোগ্য নয়। এই পদনামটি পরিবর্তন হওয়া উচিত।’

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসক বা প্রশাসক হন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। রাষ্ট্রের প্রধান আইনি দলিল সংবিধানে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদে ‘নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর’ প্রজাতন্ত্রের প্রশাসনিক শাসনের ভার প্রদানের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রজাতন্ত্রের প্রশাসনিক ইউনিটগুলো নির্বাচিত প্রতিনিধির নেতৃত্বে পরিচালিত হবে। বাস্তবতা হচ্ছে এর কোনোটিই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে না। উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ গঠন করা হলেও কার্যত এসব প্রতিষ্ঠানকে আলংকারিক করে রাখা হয়েছে। উপজেলা চেয়ারম্যানরা সরকারের কাছ থেকে তাদের সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়ে এখন আদালতে মামলা লড়ছেন।

এর মধ্যে ২০০৭ সালে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের পর ডিসিরা শুধু নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেসির দায়িত্বে থাকেন, যেটিও সংবিধান সম্মত নয়। বিষয়টি নিয়ে আদালতের রায় এখনো অপেক্ষমাণ। তাই সময়ের বিবর্তনে ‘জেলা প্রশাসক’ পদনামটি ব্যবহার কেন হচ্ছে? পদ দিয়ে সম্মান পাওয়া যায় না, সম্মান পেতে হলে অন্যকে সম্মান দিতে হয়।’

লেখকঃ ‘দি ডেইলি অবজারভার’ পত্রিকার কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি, সম্পাদক-প্রকাশক ‘দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল’ ও পিএইচ.ডি (গণমাধ্যামবিষয়ক আইন)। মোবাইলঃ ০১৭১৬৮৫৬৭২৮, ইমেইল:seraj.pramanik@gmail.com


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

এক ক্লিকে বিভাগের খবর

Archives